যশোর প্রতিনিধি:
যশোরের অভয়নগরে শরীরে আগুন দিয়ে হত্যাচেষ্টার শিকার যুবক রুবেল হোসেন (৩৫) অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘ কয়েকদিন ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এর আগে, ঈদুল আজহার পরদিন সকালে অভয়নগরের একটি গ্রামে ভয়াবহ এ ঘটনা ঘটে। অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় প্রাণ বাঁচাতে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে রুবেল মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেও তার শ্বাসনালীসহ শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ পুড়ে যায় বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, সাংসারিক বিরোধের জেরে বিচ্ছেদের প্রায় ৯ মাস পর সাবেক স্ত্রী পারভিনের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে পুনরায় সংসার করার আশায় তার বাড়িতে যান রুবেল। সেখানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে মারধরের পর শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় সাবেক স্ত্রী পারভিন, তার দুলাভাই জাফর ইকবালসহ শ্বশুরবাড়ির কয়েকজন সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে পরিবার।
তবে অভিযুক্তদের দাবি ছিল, রুবেল নিজেই নিজের শরীরে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।
রুবেলের মৃত্যুর আগে চ্যানেল দুর্জয়সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনায় পারভিন ও তার দুলাভাই জাফর ইকবালের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এলেও, পরিবারের দাবি অনুযায়ী অভয়নগর থানা শুরু থেকেই মামলা নিতে গড়িমসি করেছে।
পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, ঘটনার পরপরই থানায় গেলেও মামলা গ্রহণে নানা টালবাহানা করা হয়। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দেওয়ার ভয়ভীতি দেখানো হয়। পরে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ ও সমালোচনার মুখে অবশেষে মামলা রেকর্ড করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
পরিবারের অভিযোগ, রুবেল যখন বার্ন ইউনিটে লাইফ সাপোর্টে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন, তখনও পুলিশ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও একটি মামলা রুজু করা হয়েছে।
অভয়নগর থানার সেকেন্ড অফিসার মিহির কুমার মণ্ডলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিবার। তাদের দাবি, অভিযোগ আমলে না নিয়ে তিনি স্থানীয় প্যানেল চেয়ারম্যানের আদেশ পালনে ব্যস্ত ছিলেন। পরে থানার ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা ইন্সপেক্টর জাহিদুল ইসলাম বিষয়টিকে অপেশাদার আচরণ হিসেবে উল্লেখ করে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং মামলা রেকর্ড করেন।
তবে রুবেলের মৃত্যুর পর নতুন করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তার পরিবার। তাদের প্রশ্ন—যে ঘটনায় একজন মানুষ ৯০ শতাংশ দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন, সেই মামলার আসামিরা এখনও কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে?
রুবেলের বাবা আশরাফ আলী মোড়ল বলেন,‘আমার ছেলেটা জীবিত অবস্থায় বিচার পায়নি। এখন মৃত্যুর পরও যদি আসামিরা গ্রেপ্তার না হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?’
স্বজনদের দাবি, এটি এখন আর শুধু হত্যাচেষ্টার মামলা নয়, রুবেলের মৃত্যুর ফলে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ডে রূপ নিয়েছে। তাই দ্রুত মামলার ধারা সংশোধন করে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
রুবেলের মৃত্যুতে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার বলছে, দ্রুত বিচার ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত না হলে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে তাদের শঙ্কা আরও বাড়বে।