নিজস্ব প্রতিবেদক : পুলিশের পরিচয় ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের এক নেতাকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আল আমিনের বিরুদ্ধে। অভিযানে সঙ্গে থাকা ওই ব্যক্তি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
শুধু তাই নয়, মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে টাকা দাবি এবং টাকা না দিলে মামলা দিয়ে হয়রানির হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি শেখহাটি এলাকায় এক গৃহবধূর বাসায় অভিযান চালিয়ে তাঁর শয়নকক্ষে প্রবেশ ও ভিডিও ধারণ এবং পরে সেই ভিডিও দেখিয়ে তাঁর স্বামীকে চাপ দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী আফরিন খান মৌ (৩০)। অভিযোগের সঙ্গে ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্রসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্রমাণ জমা দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে আফরিন বলেন, গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টার দিকে তাঁর স্বামী রাজু আহমেদ ব্যবসায়িক কাজে বাইরে ছিলেন। তিনি শেখহাটি বাবলতলা (আদর্শপাড়া) এলাকার ভাড়া বাসায় দুই শিশুসন্তানকে অবস্থান করছিলেন।
এ সময় এসআই আল আমিন কোমরে পিস্তল ও ওয়াকিটকি গুঁজে এক যুবককে সঙ্গে নিয়ে বাসায় প্রবেশ করেন। ওই যুবককে আল আমিন ‘সার্কেল অফিসের লোক’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন বলে অভিযোগ আফরিনের।
বাসায় ঢুকে তল্লাশি করতে চাইলে আফরিন পরোয়ানা ও অভিযানের কারণ জানতে চান। তাঁর অভিযোগ, এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আল আমিন দরজা না খুললে সমস্যা হবে বলে হুমকি দেন। দুই শিশুসন্তান নিয়ে বাসায় একা থাকায় এবং সঙ্গে নারী পুলিশ সদস্য না থাকায় তিনি ঘরে প্রবেশে আপত্তি জানান।
আফরিনের দাবি, এ সময় আল আমিন তাঁকে গালিগালাজ ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। পরে তাঁর স্বামী মাদক মামলার পলাতক আসামি এমন দাবি করে তাঁকে ধরতে এসেছেন বলে জানানো হয়। এরপর তাঁর শয়নকক্ষসহ বাসার বিভিন্ন স্থানে প্রবেশ করে ভিডিও ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগকারী জানান, বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তিনি নিজের মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। এতে এসআই আল আমিন বাধা দেন। তবে ঘটনার মধ্যে প্রায় দুই মিনিটের একটি ভিডিও ধারণ করতে সক্ষম হন তিনি।
আফরিনের অভিযোগ, তাঁর অনুমতি ছাড়াই তাঁর মুখমণ্ডল ও শয়নকক্ষের ভিডিও ধারণ করা হয়। ভিডিও মুছে ফেলার অনুরোধ জানালে তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। একপর্যায়ে তাঁকে উদ্দেশ করে ‘ভিডিও দিয়ে কী হয় দেখিস’ এ ধরনের কথা বলা হয় বলেও অভিযোগ তাঁর।
অভিযান শেষে আল আমিনের সঙ্গে থাকা যুবক পুলিশ সদস্য নন বলে জানতে পারেন বলে দাবি করেন আফরিন। এতে তিনি ও তাঁর দুই সন্তান আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
ঘটনার পর বিভিন্ন সময়ে তাঁর স্বামী রাজু আহমেদকে শহরের বিভিন্ন স্থানে ডেকে নেন এসআই আল আমিন। সেখানে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে ধারণ করা ভিডিও দেখিয়ে তাঁকে চাপ দেওয়া হয়।
রাজুর অভিযোগ, তাঁর স্ত্রী পুলিশের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন এবং এর ‘মাশুল’ তাঁকে দিতে হবে বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে তাঁকে মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে এলাকা ছাড়া করার ভয় দেখানো হয়।
রাজুর দাবি, একপর্যায়ে এসআই আল আমিন তাঁর কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অপারগতা জানালে চাপ আরও বাড়তে থাকে। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ২০ হাজার টাকা দিতে রাজি হন। তবে এতেও আল আমিন সন্তুষ্ট হননি। পরে ‘সার্কেল এসপি’র দোহাই দিয়ে টাকার পরিমাণ বাড়ানোর জন্য চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন রাজু।
এর আগে গত ২৬ জুলাই রাজুর ভাড়া বাসার পাশের মুদি দোকানি মিজানুর রহমানকে ৪০ পুরিয়া গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ওই অভিযানে এসআই দেবাশীষ হালদার, এসআই আল আমিন ও এসআই মাসুম বিল্লাহর নেতৃত্বে একটি দল অংশ নেয় বলে জানা গেছে।
রাজু বলেন, ওই মামলায় তাঁকেও আসামি করে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখান আল আমিন ।
আফরিনের দাবি, ৩ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ ও ডিজিটাল প্রমাণ জমা দেন। একই দিন বিকেলে ২৬ জুলাইয়ের ওই মাদক মামলায় রাজুর নাম ‘তদন্তে সন্দিগ্ধ’ হিসেবে যুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে এসআই আল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ১৫ সেপ্টেম্বর রাজুর বাসায় যাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে তাঁর দাবি, রাজু একটি মাদক মামলার পলাতক আসামি। ঘটনার দিন তিনি ‘মোবাইল ডাবল ওয়ান’ ডিউটিতে ছিলেন। রাজুর বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় খোঁজ নিতে সেখানে যান। তাঁর সঙ্গে রাব্বি নামে একজন ছিলেন বলেও স্বীকার করেন আল আমিন।
আল আমিনের দাবি, রাজু মাদক মামলার পলাতক আসামি ছিলেন। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজুর নামে কোনো মামলা চলমান ছিল না। গত ২৬ জুলাইয়ে সেই মিজানুর রহমান নামের মাদক ব্যবসায়ীর মামলায় রাজুর নাম ‘তদন্তে সন্দিগ্ধ’ লিখে অন্তর্ভুক্ত করেছেন আল আমিন।
অপরদিকে, অভিযানের সময় ধারণ করা আফরিনের ভিডিওতে এসআই আল আমিনের সঙ্গে থাকা যুবকের পরিচয় শেখ রাব্বি হোসেন রানা এবং সে পুলিশ সদস্য নয় বলে নিশ্চিত করেছেন পুলিশেরই অভ্যন্তরীন একটি সূত্র।
ভুক্তভোগী পরিবারটির সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পেরেছেন রাব্বি হোসেন রানা পুলিশের সদস্য নন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিন চাকলাদারের অনুসারী ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের পর কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন রাব্বি। এখন তিনি পুলিশের ছত্রছায়ায় চলাফেরা ও বিভিন্ন অভিযানে যুক্ত হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে রাব্বি ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কমান্ড’ যশোর জেলা শাখার সভাপতি পদে রয়েছেন বলেও দাবি করেছে পরিবার।
এ ব্যাপারে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোন বক্তব্য দেয়া হয়নি৷ তবে এনএসআই সহ পুলিশের অন্যান্য গোয়ান্দা ইউনিট বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছেন৷




















