ছবিটিকে আমি মোটেও ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি না। বরং এটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকদের প্রকৃত ভূমিকা কী হওয়া উচিত।
সাংবাদিকতার মূল শক্তি সত্য প্রকাশ, জনমত গঠন এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একটি দায়িত্বশীল সেতুবন্ধন তৈরি করাই সাংবাদিকতার অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য সাংবাদিককে ভয়, চাপ বা রাজনৈতিক পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে হয়।
দুঃখজনকভাবে, একটি সাধারণ অনুষ্ঠানের ছবি ঘিরে বিভিন্ন মাধ্যমে যেভাবে পোস্ট, মন্তব্য ও হাস্যরস করা হয়েছে, তা পোস্ট কারীদের চিন্তার পরিধি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ভিন্নমত অবশ্যই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তবে প্রতিটি বিষয়কে রাজনৈতিক চশমায় দেখা গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো , সরকারের ভয় বা চাপ ছাড়া যে কোনো নাগরিক কিংবা সাংবাদিক রাষ্ট্রের যে কোনো সিদ্ধান্তের পক্ষে বা বিপক্ষে মত প্রকাশ করতে পারবেন। একইভাবে, প্রশাসনিক, সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ে কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকে রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না, যদি সেখানে দলীয় প্রচার, স্লোগান, প্রতীক কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচির কোনো উপাদান উপস্থিত না থাকে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে সবার নিজস্ব মতামত থাকতে পারে। কিন্তু কোনো ব্যক্তির সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক, পেশাগত কিংবা সামাজিক পর্যায়ের সম্পৃক্ততাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক সমর্থন হিসেবে ব্যাখ্যা করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
একজন মানুষের পরিচয় সবসময় একই থাকে না; দায়িত্ব ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তা পরিবর্তিত হয়। একজন সাংবাদিক যখন পরিবারের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তিনি পরিবারে সাংবাদিক পরিচয়ে নন; তিনি বাবা, স্বামী কিংবা সন্তান হিসেবেই পরিচিত। একইভাবে, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি যদি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে অংশ নেন, তবে সেই প্রেক্ষাপটে তাঁর পরিচয়ও প্রাতিষ্ঠানিক। সেখানে দলীয় পরিচয়কে জোর করে সামনে আনা যুক্তিসঙ্গত নয়। যেখানে রাজনীতির স্থান নেই এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালাই চূড়ান্ত, সেখানে রাজনৈতিক পরিচয় চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগও নেই।
শহীদ সাংবাদিক শামছুর রহমান মিলনায়তনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সংবাদে যশোরের শীর্ষস্থানীয় প্রিন্ট গণমাধ্যমগুলো জেলা পরিষদের প্রশাসককে প্রশাসনিক পরিচয়েই উল্লেখ করেছে; তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ করেনি। একইভাবে, উপস্থিত অন্যদের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক পরিচয়ই ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও সাংবাদিক নেতাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ তুলে ধরা হয়নি; বরং প্রেসক্লাব কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে তাঁদের দায়িত্ব ও পদবিই উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবাদ উপস্থাপনার ধরন ও অনুষ্ঠানের প্রকৃতি থেকে প্রতীয়মান হয়, এটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন। তাই আয়োজকদের জন্য উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করা যেমন বাধ্যতামূলক নয়, তেমনি প্রাসঙ্গিকও নয়।
দুঃখের বিষয়, কেউ কেউ এই ছবিকে কেন্দ্র করে এমনভাবে সমালোচনা করেছেন, যাতে মনে হয়েছে মূল আয়োজনের চেয়ে বিতর্কই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এমনকি কিছু সাংবাদিকও সেই প্রবণতায় শামিল হয়েছেন। অথচ একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার আগে অন্তত একবার ভাবা উচিত ছিল—যদি এতে প্রকৃতপক্ষে কোনো আইনগত বা নীতিগত অসঙ্গতি থাকত, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় নিত।
এ ধরনের তড়িঘড়ি মন্তব্য শুধু প্রবীণ সাংবাদিকদের অযথা হাস্যরসের পাত্রে পরিণত করেনি; বরং মন্তব্যকারীদের নিজস্ব বিশ্লেষণ, গবেষণা ও বিচারবোধের সীমাও প্রকাশ করেছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন সবার আছে, তেমনি সেই মতের দায়ও প্রত্যেককেই বহন করতে হয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক শহীদ সাংবাদিক শামছুর রহমানের স্মৃতিকে ঘিরে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করেছে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও কষ্ট দিয়েছে। এটি কারও কাম্য হওয়ার কথা নয়।
আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য—যাঁর ছবিতে লাল বৃত্ত এঁকে নানা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, সেই মীর মোশাররফ হোসেন বাবু প্রেসক্লাব যশোরের জীবন সদস্য এবং অনুষ্ঠানের স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী।
মজার বিষয় হলো, আজ যারা এই ছবি নিয়ে সমালোচনা করছেন, তাঁদেরই একজন ২০২৩ সালের ৯ জুন হোটেল ওরিয়ন ইন্টারন্যাশনালে অনুষ্ঠিত মীর মোশাররফ হোসেন বাবুর ছেলের বৌভাত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিজের ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন-
“প্রেসক্লাব যশোরের জীবন সদস্য মোশাররফ হোসেন বাবু ভাইয়ের ছেলের বউভাত অনুষ্ঠানে, হোটেল ওরিয়ন ইন্টারন্যাশনাল। নবদম্পতির জন্য দোয়া রইল।”
এখানে প্রশ্ন থেকেই যায়—তখন যাঁর সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে কোনো আপত্তি ছিল না, আজ সেই একই ব্যক্তিকে ঘিরে আপত্তির ভিত্তি কী?
পরিশেষে, একটি বিনীত প্রশ্ন , রাষ্ট্রের কোন আইন, বিধি বা নীতিমালার আলোকে এই ছবিতে লাল বৃত্ত এঁকে সেটিকে বিতর্কিত হিসেবে উপস্থাপন করাকে প্রয়োজনীয় বা যৌক্তিক বলে মনে হয়েছে?
✒ সালাহ্উদ্দীন সাগর।















