অনুসন্ধান, চৌগাছা (যশোর)অফিস:
যশোরের চৌগাছায় দীর্ঘদিনের পারিবারিক জমি ভোগদখল দ্বন্দ্ব এবার গড়িয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মারধর ও লুটপাটের মতো গুরুতর অভিযোগে মামলায়। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের একটি বড় অংশের দাবি—পুলিশকে ব্যবহার করতে না পেরে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে এই মামলা দায়ের করেছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) মাকাপুর গ্রামের বাসিন্দা তামান্না নাজনীন লাভলী যশোর আদালতে মামলাটি করেন। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, প্রায় ৪০ বিঘা জমির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বাদী ও তার মেজ ভাইয়ের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, উভয় পক্ষই নিজেদের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। তবে পুলিশ বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তির পরামর্শ দিলে বিরোধ আরও তীব্র হয়।
স্থানীয়দের মতে, পুলিশ নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ায় এক পক্ষ তাদের প্রত্যাশিত সুবিধা না পেয়ে ক্ষোভে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
মামলায় চৌগাছা থানার সাবেক ওসি আনোয়ার হোসেনসহ চার পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে তাদেরই নিকটতম প্রতিবেশিরা এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন এবং পরিবারটিকে ‘মামলাবাজ’ বলে দাবি করেছেন।
একাধিক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে চলা পারিবারিক দ্বন্দ্বে পুলিশকে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় পরিস্থিতি এই পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক প্রকার ক্ষোভের বসেই পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পরিবারটি।
এই পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হায়দার আলীর মৃত্যু। তিনি উপজেলার সুকপুকুরিয়া ইউনিয়নের মাকাপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এবং ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
মৃত্যুর চার মাস পর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি তার বোন হামিদা বেগম বাদী হয়ে হায়দার আলীর ছেলে-মেয়েসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে ২৩ জানুয়ারি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহাত খান ও পুলিশের উপস্থিতিতে কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে পুনরায় ময়নাতদন্ত করা হয়—যা এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। স্থানীয়দের ভাষায়, “জমির জন্য ওরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে।”
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালে। লন্ডনে কর্মরত ব্যারিস্টার একেএম মর্তুজা রাসেল বাড়িতে স্থাপন করা সিসিটিভি ক্যামেরায় তার বৃদ্ধ পিতা হায়দার আলীর ওপর নির্যাতনের দৃশ্য দেখার দাবি করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২২ সালের ২৪ এপ্রিল তাকে সিঁড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয়, এতে তিনি গুরুতর আহত হন। এছাড়া নিয়মিত মারধর, খাবার না দেওয়া এবং শীতের রাতে কষ্ট দেওয়ার ঘটনাও ফুটেজে ধরা পড়ে বলে দাবি করা হয়।
রাসেল ২০২৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরে আদালতের মাধ্যমে বাবাকে নিজের জিম্মায় নিয়ে চিকিৎসা করান। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ অক্টোবর তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় রাসেলের ফুফু হামিদা বেগম হত্যা মামলা দায়ের করেন। অপরদিকে, ০৯ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে রাসেলের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেন তার মা লতিফা হায়দার ও অন্য ভাইবোনেরা।
লতিফা হায়দার অভিযোগ করেন, উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যারিস্টার বানানো সন্তানই এখন তাকে কারাগারে পাঠাতে চাচ্ছেন। তিনি জানান, ২০০৭ সালে ছেলেকে লন্ডনে পাঠাতে প্রায় ২০ লাখ এবং ২০১৬ সালে আরও ৩৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়।
তার দাবি, এই আর্থিক বিরোধ থেকেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি। পরিবারের অন্য সদস্যদের মতে, ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ জমি দখল হয়ে গেছে এবং বাকি জমিও দখলের চেষ্টা চলছে।
অপরদিকে, ব্যারিস্টার রাসেল তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার কোনো সম্পত্তির লোভ নেই। বরং তার মা ও ভাইবোনরা নির্যাতন ও ‘স্লো পয়জনিং’-এর মাধ্যমে তার বাবাকে অসুস্থ করে সম্পত্তি লিখে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবারে বিরোধ চলছিল এবং বিভিন্নভাবে পুলিশকে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে পুলিশ হস্তক্ষেপ না করায় একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে মামলা করেছে বলে তারা মনে করেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক বিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জড়িয়ে পরে তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা।
বর্তমানে মামলাটি পিবিআই তদন্তাধীন। স্খানীয়রা বলছেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই এই জটিল ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে। তারাও চান এই বিরোধের সমাপ্তি ঘটুক।