যশোর প্রতিনিধি :
যশোরের একসময়ের খরস্রোতা ভৈরব নদ এখন দখল ও দূষণে মৃতপ্রায়। প্রশাসনের একাধিক সতর্কতা, মামলা ও জরিমানার পরও দূষণের মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যশোর অঞ্চলের ২৪টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি ভৈরব নদ দূষণের জন্য দায়ী। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র পাঁচটির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপ ছিল সীমিত পর্যায়ের, যা সচেতন নাগরিকদের কাছে অপ্রতুল মনে হয়েছে।
দূষণের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে, যশোর পৌর এলাকার কুইন্স হাসপাতাল, অসীম ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কিংস হাসপাতাল, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাবজোন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পদ্মা নার্সিং হোম, অর্থোপেডিক হাসপাতাল, ইউনিক হাসপাতাল, ওরিয়ন হোটেল ইন্টারন্যাশনাল, ভৈরব হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, দড়াটানা হাসপাতাল, একতা হাসপাতাল, মডার্ন হাসপাতাল, রেনেসা হাসপাতাল, প্রিন্স ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আলট্রাভিশন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, স্ক্যান হাসপাতাল এবং দেশ ক্লিনিক।
এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার নোটিশ প্রদান করা হয়েছে, ৫টির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং ১টি প্রতিষ্ঠানকে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) নির্মাণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বারীনগর ও নওয়াপাড়া এলাকায় ভৈরব নদ দূষণের সঙ্গে জড়িত রয়েছে এস কে অটো রাইস মিল, ফয়সাল জিলেটিন, পালস ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং জারবান ফাইবার্স লিমিটেড। এসবের মধ্যে পালস ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ২০ হাজার টাকা এবং আরোগ্য সদন হাসপাতালকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর সম্প্রতি দড়াটানা ও বারান্দীপাড়া ব্রিজ এলাকার পানির মান পরীক্ষা করে ভয়াবহ দূষণের প্রমাণ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির যশোর জেলার উপপরিচালক এমদাদুল হক জানান, ওইসব এলাকার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ এতটাই কম যে সেখানে জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা অসম্ভব। একইসঙ্গে নদীর তীরে বসবাসরত মানুষেরাও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।
তিনি জানান, দড়াটানা পয়েন্টে ডিজলভ অক্সিজেনের (ডিও) মান পাওয়া গেছে ৩.৮১ শতাংশ এবং বারান্দীপাড়া ব্রিজ এলাকায় ৪.৬৯ শতাংশ, যেখানে স্বাভাবিক মান হওয়া উচিত ৫-এর বেশি। অন্যদিকে জৈব রাসায়নিক অক্সিজেন (বিওডি) মান স্বাভাবিক সীমার চেয়ে অনেক বেশি—দড়াটানায় ৯ এবং বারান্দীপাড়ায় ১০, যেখানে স্বাভাবিক মান ৬-এর নিচে থাকা উচিত।
সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিশ বা সামান্য জরিমানা দূষণ রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। মামলা করলেও সেগুলোর নিষ্পত্তি ধীরগতিতে হচ্ছে, আর ইটিপি স্থাপনের নির্দেশনা বাস্তবায়নে নেই নিয়মিত তদারকি।
পৌর সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, “দু’একটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা বা মামলা করে লাভ হবে না; এখন প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ।”
ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলন কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, “ভৈরব নদ সংস্কারের নামে সরকার বহু প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও তার বাস্তব ফলাফল আশানুরূপ নয়।”
তিনি স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কঠোর হয়ে নদীর দখল ও দূষণ রোধে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান।
যশোরের ভৈরব নদ শুধু একটি জলধারা নয় এটি এই অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। খুলনা-যশোর অঞ্চলের দীর্ঘতম এই নদ একসময় পদ্মারই একটি স্রোতধারা ছিল। এখন তা বাঁচানোর লড়াইয়ে ব্যস্ত নদীপ্রেমী মানুষগুলো।
Leave a Reply