যশোর প্রতিনিধি :
দখল ও দূষণের চাপে সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছেছে যশোরের ঐতিহ্যবাহী ভৈরব নদ। এক সময়ের খরস্রোতা এই নদ এখন শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। যে যেমন পারছে, নদ দখল করে নিচ্ছে নিজের মতো করে। খননের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও তাতে নাব্যতা ফেরেনি, বরং প্রকল্পই পরিণত হয়েছে দুর্নীতির প্রতীকে। ২৭৯ কোটি টাকার ওই প্রকল্পের সুফল আজও অধরাই। নদ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভে ফুঁসছে স্থানীয় জনগণ ও পরিবেশ সচেতন মহল।
বছরের পর বছর ধরে ভৈরব নদ দখল হয়ে চললেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কাছে এখনো দখলদারদের হালনাগাদ তালিকা নেই। এক সময় ১২৭টি প্রতিষ্ঠানের নাম তালিকায় থাকলেও, এখন তা রহস্যজনকভাবে ছোট হয়ে এসেছে। রাজনৈতিক প্রভাব এখন কম হলেও কেন উচ্ছেদ অভিযান হচ্ছে না— এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি সংস্থাটি।
২০১৬ সালে ভৈরব নদ পুনঃখনন ও জোয়ার-ভাটা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ২৭২ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়, পরবর্তীতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭৯ কোটিতে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০২২ সালে। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয় করেও নদে আগের নাব্যতা ফেরেনি। এখন নদটি প্রায় মৃতপ্রায়— মাঝখানে শুকনো পলি, দু’পাশে স্থির জল, কোথাও কোথাও কচুরিপানায় ঢেকে আছে প্রবাহপথ।
প্রকল্প চলাকালীন থেকেই খননে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু তদন্ত হয়নি। অভিযোগ রয়েছে— পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মিলে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সব অনিয়ম ‘বৈধ’ করে ফেলা হয়েছিল বলে দাবি স্থানীয়দের।
বসুন্দিয়া এলাকার বাসিন্দারা জানান, খননের আগে আফ্রা ঘাট থেকে ছাতিয়ানতলা পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় প্রবল জোয়ার উঠত। এখনো সামান্য জোয়ার ওঠে, কিন্তু পানির গতি একেবারেই কম। সেতুগুলোর পাশে মাটি না কাটায় পানি আটকে থাকে।
রাজারহাট এলাকার মানুষের প্রশ্ন— “ব্রিজের কারণে জোয়ারভাটা বন্ধ ছিল বলে পাউবো দাবি করত, কিন্তু এখন নতুন ব্রিজ হওয়ার পরও কেনো জোয়ার আসে না? নদে গতি ফিরছে না কেন?”
পরিবেশ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয়ের উপপরিচালক এমদাদুল হক বলেন, “ভৈরব নদের শহরাঞ্চলে দূষণের জন্য ২৭টি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত ও জরিমানা করেও তেমন ফল পাওয়া যায়নি। চার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, আরও কয়েকটির প্রস্তুতি চলছে।”
যশোর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান জানান, “ভৈরব নদ খননে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার বিষয়ে আমরা তিনটি আবেদন পাঠিয়েছিলাম দুদকের প্রধান কার্যালয়ে। কিন্তু সেগুলোর কোনো সাড়া পাইনি, চিঠিগুলো গায়েব হয়ে যায়।”
দুদকের যশোর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) আল আমিন বলেন, “এই বিষয়ে কোনো অনুসন্ধানের চিঠি দেওয়া হয়েছিল কিনা, সে তথ্য আমার জানা নেই।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, “আগে উচ্ছেদ অভিযানে ঝামেলা হয়েছিল। দড়াটানার স্ক্যান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মামলা করেছিল। তবে আবারও উচ্ছেদ অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, “রাজারহাটে নতুন ব্রিজ নির্মাণের সময় তলদেশে যে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল, সেটি এখনো সরানো হয়নি। ওই বাঁধের কারণে শহরের দিকে পানি ঢুকতে পারছে না। সম্প্রতি কিছু কচুরিপানা পরিষ্কার করা হয়েছে।”
স্থানীয়রা বলছেন, একসময় জীবন্ত ভৈরব এখন প্রায় মৃত। দুর্নীতি, দখল আর উদাসীনতার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে যশোরের প্রাণভোমরা এই নদ।
Leave a Reply