একজন সার্জন একজন বিশেষজ্ঞ হতে পারেন কিন্তু সকল বিশেষজ্ঞ সার্জন নন
গাইনি সার্জনরা প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে নিজেরাই অ্যানেসথেসিয়া দিতে পারেন।
রাজমিস্ত্রী আর সিভিল ইঞ্জিনিয়ার—দুজনেই নির্মাণ কাজ করেন, তবে দায়িত্ব ও যোগ্যতায় বড় পার্থক্য। চিকিৎসাক্ষেত্রেও এমন বিভ্রান্তি প্রায়ই দেখা যায়। একজন নিউরোলোজিস্ট, সার্জন বা সাধারণ এমবিবিএস চিকিৎসক কি অপারেশনের সময় রোগীকে অজ্ঞান করতে পারেন? উত্তরটি সরল: না, পারেন না—যদি তিনি এনেসথেসিয়ার প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত না হন।
বাংলাদেশে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, এনেসথেসিয়া (অজ্ঞান করার চিকিৎসা) দিতে হলে অবশ্যই স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এমডি (ডক্টর অব মেডিসিন), এমএস (মাস্টার অব সার্জারি) অথবা ডিএনবি (ডিপ্লোমেট অফ ন্যাশনাল বোর্ড) ডিগ্রি থাকতে হবে, যা এনেসথেসিয়ায় বিশেষায়িত। শুধু ডিগ্রি থাকলেই হবে না—সঙ্গে প্রয়োজন লাইসেন্সিং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। অনেক চিকিৎসক এর পাশাপাশি বোর্ড সার্টিফিকেশনও গ্রহণ করেন, যা ঐচ্ছিক হলেও তাদের বিশেষজ্ঞ পরিচিতিকে আরো পোক্ত করে তোলে।
না, নিউরোলোজিস্ট রোগীর স্নায়ুতন্ত্র সম্পর্কিত সমস্যা নির্ণয় ও চিকিৎসা করেন। অপারেশনের প্রয়োজন হলে তিনি রোগীকে নিউরোসার্জনের কাছে রেফার করেন। এরপর নিউরোসার্জন অস্ত্রোপচার করেন, কিন্তু রোগীকে অজ্ঞান করার কাজটি করেন একজন আলাদা অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ।
অর্থাৎ, নিউরোলোজিস্ট অ্যানেসথেসিয়া দিতে পারেন শুধুমাত্র তখনই, যদি তিনি অতিরিক্তভাবে এনেসথেসিয়ায় এমডি/এমএস/ডিএনবি ডিগ্রিধারী ও লাইসেন্সপ্রাপ্তও হন।
সাধারণত এমবিবিএস চিকিৎসকেরা প্রাথমিক ও কিছু মৌলিক অস্ত্রোপচার যেমন খৎনা, ভ্যাসেকটমি, ত্বক বা স্তনের টিউমার অপসারণ ইত্যাদি করতে পারেন। এমনকি জরুরি প্রয়োজনে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারিও সম্পাদন করতে পারেন, তবে তা সীমিত এবং গুরুতর ঝুঁকিপূর্ণ নয়—এই শর্তে।
তবে, কোনোভাবেই একজন সাধারণ এমবিবিএস চিকিৎসক এনেসথেসিয়া দিতে পারেন না। এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি চিকিৎসা-প্রক্রিয়া, যার জন্য আলাদা ও উচ্চমানের প্রশিক্ষণ অপরিহার্য।
১. সাধারণ এনেসথেসিয়া: পুরো শরীর অজ্ঞান করা হয়, জটিল ও দীর্ঘ অপারেশনে ব্যবহৃত হয়।
২. আঞ্চলিক এনেসথেসিয়া: শরীরের নির্দিষ্ট অংশ অবশ করা হয়, যেমন কোমরের নিচ থেকে।
৩. স্থানীয় এনেসথেসিয়া: ছোট আকারের চিকিৎসা যেমন দাঁত তোলা বা সেলাইয়ের সময় প্রয়োগ করা হয়।
প্রত্যেক ধরনের এনেসথেসিয়াই রোগীর পূর্ণ স্বাস্থ্য যাচাই (প্রি-অপারেটিভ অ্যাসেসমেন্ট) শেষে, অত্যন্ত সচেতনভাবে প্রয়োগ করতে হয়।
গাইনি চিকিৎসকরা মহিলাদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন, তবে অস্ত্রোপচার যেমন সিজারিয়ান ডেলিভারির জন্য তাঁদের সার্জন প্রশিক্ষণ থাকতে হয়। একজন গাইনি সার্জন সাধারণত এনেসথেসিস্টের তত্ত্বাবধানে এনেসথেসিয়া দিয়ে অপারেশন করেন। সেক্ষেত্রেও একজন স্বীকৃত অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক সরাসরি দায়িত্বে থাকেন। গাইনি চিকিৎসক এনেসথেসিয়া দিতে পারেন না—এটি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। গাইনি সার্জনরা প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে নিজেরাই অ্যানেসথেসিয়া দিতে পারেন। তবে জটিল বা দীর্ঘ অস্ত্রোপচারে একজন এনেসথেসিস্টের তত্ত্বাবধান নিরাপদ। জরুরি প্রসব বা জটিল অপারেশনে রোগীর অবস্থা বিবেচনায় উপযুক্ত অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগে বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয়।
সব সার্জনই চিকিৎসক, তবে সব চিকিৎসক সার্জন নন। উদাহরণস্বরূপ, একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট দেন, কিন্তু অস্ত্রোপচার করেন না। অন্যদিকে, একজন সাধারণ সার্জন বা গাইনি সার্জন অপারেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা সম্পন্ন করেন।
দুঃখজনকভাবে দেশের অনেক হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ওটি বয় (অপারেশন থিয়েটারের সহকারী) বা সাধারণ এমবিবিএস চিকিৎসকরাও এনেসথেসিয়া প্রয়োগ করছেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি, অনৈতিক এবং রোগীর জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে রোগী মৃত্যুর জন্য এটাই প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এমনকি শোনা যায়, কার্ডিয়াক সার্জন বা নিউরো সার্জন কোনো প্রসূতির সিজারিয়ান ডেলিভারি করিয়েছেন—যা চিকিৎসাগতভাবে অনুমোদিত নয়।
চিকিৎসা একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র। একজন চিকিৎসকের ক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার বাইরে গিয়ে অন্য শাখার কাজ করাটা যেমন রোগীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে, তেমনি চিকিৎসা পেশার নৈতিকতাও ভেঙে দেয়। চিকিৎসায় যেমন জ্ঞান ও যোগ্যতা দরকার, তেমনি সুনির্দিষ্টতা ও শৃঙ্খলা অনিবার্য।
সুতরাং, রোগীর জীবন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়—প্রতিটি চিকিৎসা-পদ্ধতি যেন অভিজ্ঞ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত চিকিৎসকের হাতে হয়, এটাই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা।

Leave a Reply